শাপে বর?


কৃত্তিমতার বিরুদ্ধাচরণ করলে প্রায়সই আজকাল দেশদ্রোহী বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবু এই দেশদ্রোহীতার সজ্ঞা কিছুটা আমার অজানা। ঠিক যেমন অজানা নেতাজীর অন্তর্ধান রহস্য। তিনি কী কোনো মহাপুরুষ ছিলেন? নাকি মেরুদণ্ডহীন, রোমাণ্টিতায় মত্ত বাঙালীর ছত্রপতির মতো কোনো দিগপাল তৈরী করার আকাঙ্খা রুপ পেয়েছে তার মধ্যে?

নারায়ণ স্যানাল এর ‘আমি নেতাজী কে দেখেছি’  তে লক্ষী স্বামীনাথন সেহগাল বলেছিলেন, -“আপনারা যেভাবে নেতাজী কে অশ্বারোহী হিসেবে দেখাতে চান, তেমন ভাবে কিন্তু নেতাজীকে আমি কখনো দেখেনি। এটা হয়তো ছত্রপতি শিবাজীর চরিত্রের প্রভাব।”

আজ নতুন করে জেগে ওঠা ‘জাতীয়তাবাদীরা’ নেতাজীকে ত্রুপের তাস এর মতো ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু নিন্দুকেরা (যার মধ্যে আমিও পড়ি) বলেন তার জীবনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বিতর্কিত, কিংবা পরস্পরবিরোধী।

আমার মনে হয় তিনি মানুষ হিসেবে একটু বেশিই বিহ্বল ছিলেন। নিজের আবেগের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে বারংবার তিনি হয়ে উঠেছেন ট্র্যাজেডির নায়ক, কিংবা self made খলনায়ক।

কে বলেছিল ওনাকে মহাত্মা গাঁধী কে আগের থেকেই মহানতার শিখন্ডী রুপে পুজো করতে হবে? কেন তিনি কংগ্রেস কে ভেঙে যাওয়া থেকে বাঁচানোর জন্যে বিনা লড়ে সপে ছিলেন সুচক্র মেদিনী?

তার মানসিক অস্হিরতা ওনাকে আমার চোখে ছোট করেছে। তার রাজনৈতিক আদর্শে লিপ্ত ছিল কিছুটা ফ্যাসিবাদ, কিছুটা সাম্যবাদ। 

দুটোর মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরী হয় এক একনায়কতন্ত্র যার মধ্যে নিভৃত থাকা ‘অসিহ্ষ্ণুতা’ একটি জাতি কে নি:শেষ করার জন্য যথেষ্ট। নেতাজীর রাষ্ট্রের প্রতি প্রেম প্রশ্নাতীত। কিন্তু মানুষের স্বার্থে গণতন্ত্র কী তিনি চেয়েছিলেন? Benevolent dictatorship বলার মধ্যে কোথাও কী মহানতা ছিল?

মাও সে তুং, যার আদর্শর কুপ্রভাব আজও দান্তেওয়ারার জঙ্গল কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে, তার people’s democracy তিয়েনানমেন এর মতো হত্যালীলার কাণ্ডারী হয়ে থেকেছে। নেতাজীর একনায়কতন্ত্রও কিছুটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছিল। 

তার অনেক ঘটনাই ইতিহাসের পাতায় অমিল কিংবা দুর্ভেদ্য।Deification কিংবা দেবত্ব হাসিল করা খুব কঠিন কাজ। কিন্তু তা করা যদি সম্ভব হয়, তাহলে  ইতিহাসবিদরা সেই ব্যক্তিত্বকে সম্ভ্রান্ত করে তুলতে সব প্রকারের হেগিওগ্রাফি রচনা করেন। বামপন্থীদের আমলের বই এ স্তালিনরা তাই বিশ্বকে দেওয়া জগদজ্জনী মাক্স এর উপহার।

এই eulogisation of history তে চাপা পরে যায় একটি চরিত্রের আরেকটি দিক। অনেকেই জানেন না, এক বণ্যাঢ়্য সমাবেশের কথা যেখানে নেতাজী কে দেখা গিয়েছিল ‘সলমান খান’ রূপে, সেখানে বেজেছিল শঙ্খের ফুঁ, সম্মান পেয়েছিল সেই narcissistic ব্যাখ্যা যা হয়তো বোসের অনেক ভক্তরাই দেখতে ও দেখাতে পছন্দ করেন। এই উদাহরণ টা কী তাহলে লক্ষী সেহগাল কে ভুল প্রমাণ করছে?

একবার মিলিটারির সাজ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল এক জাতীয় কংগ্রেসের প্রধান কর্মসূচীতে। সুভাষ সেই প্রোগ্রামের হোতা ছিলেন। তা দেখে তথাকথিত ‘মহাত্মা’ ব্যাঙ্গাত্মক স্বরে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

মিলিটারি ও আর্মি পোষাকের প্রতি দুর্বলতা রাখা সুভাষ তো পরবর্তীকালে আয়ুব খান হতেই পারতেন। নাৎজি বাহিনীর প্রতি তার সমবেদনা কারো অজানা নয়। হিটলার, নিজের জাতশত্রু বৃটিশ দের বলতেন “ভারতীয়দের গুলি মেরে উড়িয়ে দাও।” তাহলে সুভাষও কী anti-national?

বারংবার তার আদর্শ হয়ে উঠেছে চরমপন্থী, তার দেশপ্রেমের বিশ্বাসে বিশ্বাস রেখেও বলতে পারি একনায়কতন্ত্র কোনোদিন দয়ালু হতে পারে না। তাই তোজোর ইমপেরিয়াল জাপানের সাথে আপোস আমার ভারতীয়তাকে আঘাত করে।তার বৃটিশ বিরোধিতা প্রশংসার দাবি রাখে, কিন্তু তার কল্পনাপ্রবণ মন তাকে বুঝতে দেয়নি যে ১০০০০ সৈন্য নিয়ে ভারত জয় করা অসম্ভব। 

কে বলতে পারে তার চরম অকাট্যতা উপমহাদেশে আরো একটি অসহনীয় মিলিটারী শাসন নিয়ে আসত না? 

ওনার অন্তর্ধান টা দেশের জন্য শাপে বর হল না তো?

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s